সাকিব আল হাসান: অর্জন আর স্বীকৃতির হিসাব

২০১৯ সালটা ছিল সাকিব আল হাসান আর তার ভক্তদের জন্য বেশ ঘটনাবহুল একটা বছর। ২০১৯ বিশ্বকাপের রেকর্ড গড়া দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর হঠাৎ করেই সাকিব আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের দুর্নীতিদমন রীতি লঙ্ঘনের কারণে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হলেন । সাকিব হয়তো খুব শীঘ্রই নেমে যাবেন নিজের ক্যারিয়ার পুনরুদ্ধারের কাজে। এরই মাজে চলুন দেখে নেয়া যাক সাকিবের ১৩ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার এর কিছু গুরুত্তপূর্ণ ঘটনা বা সিদ্ধান্ত যা তার ক্যরিয়ার এর গতিনির্দেশক হিসাবে ভূমিকা রেখেছে। কয়েক খন্ডের এই লেখায় সাকিবের ক্যারিয়ার এর একাধিক ভুল এবং অর্জনসহ বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলো। প্রথম খন্ডে থাকছে সাকিবের ক্যারিয়ার এর অর্জনের সাথে তার প্রাপ্ত মর্যাদার হিসাবের মিল অমিল।

Click here to read this Article in English

বাংলাদেশ দলের যেকোনো খেলোয়াড় বা কোচকে যদি সাকিবের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন করেন, প্রায় প্রত্যেকেই এই একটি উত্তরই দেবে – একজন সাকিব আল হাসান হচ্ছে দুইজন খেলোয়াড়ের সমান, কারণ সাকিব একই সাথে ব্যাটিং ও বোলিং এ সমান পারদর্শী, এবং সেই দক্ষতার জোরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাকিব এর জায়গা বেশ কয়েক বছর ধরেই যথেষ্ট পরিপক্ক। ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে সাকিব তার রেকর্ড গড়া অনবদ্য ব্যাটিং (৬০৬ রান) আর বোলিং (১০ উইকেট) পারফরমেন্স দিয়ে ক্রিকেট অঙ্গনে নিজেকে আবার নতুন করে চিনিয়েছেন আর যারা সাকিবকে ভুলতে বসেছিলেন তাদের কে ঘুরে থাকতে বাধ্য করেছেন। রেকর্ড গড়া সব পারফরমেন্স এর পরই শুরু হয় সাকিবকে নিয়ে ক্রিকেট বোদ্ধাদের একের পর এক বিশ্লেষণ, এর সাথে অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেন, সাকিবের যোগ্যতা আর অর্জনের সাথে প্রাপ্ত মর্যাদার কোথায় যেন একটা গরমিল।

র‍্যাঙ্কিং এ সাকিবের অধিপত্ব

সাকিব বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার কিনা তা নিয়ে জোর মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি ) আনুষ্ঠানিক র‍্যাঙ্কিংকে সবার আগে বিবেচনায় আনলে সাকিবের আধিপত্য উপেক্ষা করা বেশ মুশকিল, কারণ গত দশ বছরে ক্রিকেটের তিন ফরমেটে আইসিসি র‍্যাঙ্কিং-এ সাকিবের অর্জনের আশেপাশে কেউ নেই।

অভিষেকের পর থেকে সাকিবের র‍্যাঙ্কিং এর কিছু উল্লেখযোগ্য দিকে নজর দিলেই সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

আন্তর্জাতিক টি-২০

→ ২০৯ নম্বর অবস্থানে অলরাউন্ডের হিসাবে অভিষেক ২০০৬ সালের জুন মাসে→ প্রথম এক নম্বরে উঠে আসেন ২০০৯ এর জানুয়ারী মাসে, অভিষেকের মাত্র ৩ মাস পর
→ টানা ২৬ মাস এক নম্বরে অবস্থান করেন ২০০৯ এর জানুয়ারী থেকে ২০১১ আর মার্চ পর্যন্ত→ আবারো টানা ২৪ মাস এক নম্বরে অবস্থান করেন জুন ২০১৫ থেকে জুন ২০১৭ পর্যন্ত
→ ২০০৯ এর জানুয়ারির পর সাকিবের অবস্থান কখনোই ৩ এর নিচে নামেনি

একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ

২০০৬ সালে অভিষেক ২৮ নম্বর অবস্থানেএক নম্বরে উঠে আসেন ২০১৫ সালের মার্চে
টানা ১১ মাস এক নম্বরে অবস্থান করেন ২০১৫ এর মার্চ থেকে ২০১৬ এর ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত২০১৪ এর মার্চ এর পর কখনোই তিনের নিচে নামেননি

টেস্ট ক্রিকেট

→ অভিষেক ২০০৭ সালের মে মাসে ১১৬ নম্বর অবস্থানে→ এক নম্বরে উঠে আসেন ২০১১ এর ডিসেম্বরে

→ টানা দশ মাস এক নম্বরে অবস্থান করেন ২০১৪ এর নভেম্বর থেকে ২০১৫ এর আগস্ট পর্যন্ত, যেটা রবিচন্দন অস্মিন এর (১৪ মাস) পর এক নম্বরে থাকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড → ২০১১ আর ডিসেম্বর এর পর কখনোই ৩ এর নিচে নেমে যাননি
এক ঝলকে সাকিবের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

র‍্যাঙ্কিং আর পরিসংখ্যানকে হিসেব থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়েও সাকিবের আধিপত্যের আরো কিছু প্রমান পাওয়া যায়। ক্রিকেট বিশ্বে খুব কম সংখ্যক খেলোয়াড়ই আছেন, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে, যারা কিনা বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া লীগ এ খেলার সুযোগ পান, কিন্তু সাকিব তার অভিষেকের পর থেকে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ঘরোয়া টি-২০ লীগে খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছেন।

বিগত কয়েক বছর ধরে সাকিব প্রায় নিয়মিত খেলে আসছেন অস্ট্রেলিয়ার বিগ বাশ, পাকিস্তানের সুপার লীগ, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের লীগ, আর ভারতের বিখ্যাত আপিএল-এ।  আর ২০১৯ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্স দিয়ে সবাই কে তাক লাগিয়ে দিয়ে সাকিব মাত্র ৮ ম্যাচ খেলে করেন ছয় শতাধীক রান (গড় ৮৬.৫৭) আর তুলে নেন এগারো টি উইকেট যা বিশ্বকাপে কোনো অলরাউন্ডারই আগে কখনো করে দেখাতে পারেননি। সাকিবের প্রায় অদ্ভুতুড়ে এই পারফরম্যান্সে অনেকেই অবাক হন, আবার অনেকেই প্রশ্ন করেন সাকিব তার ক্যারিয়ার জুড়ে তার প্রাপ্প সন্মানটুকু পেলো কিনা।

সাকিবের অর্জন আর স্বীকৃতি

সাকিব তার পারফর্মেন্সের বিনিময়ে সব সময় ক্রিকেটপ্রেমী বা বোদ্ধাদের কাছ থেকে প্রাপ্য স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে কিনা সেটা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের উপরে। প্রথমেই আসবে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপারটা, কিংবা নিজনিজ ক্রিকেট দর্শন, এবং তার চেয়েও গুরুত্তপূর্ণ হবে সেই ভক্ত বা বোদ্ধার ভৌগোলিক অবস্থানের উপর। কিম্বার (২০১৯) যেমন লিখেছেন, একজন বাংলাদেশী ভক্তের কাছে সাকিবই শুরু আর সাকিবই শেষ, তাদের কাছে সাকিব যেন এক ৫০ ফুট দানব, বিশেষ কোনো ত্রাণকর্তা, এক মহানায়ক, কিন্তু বাংলাদেশের বাইরে সাধারণ কোনো ক্রিকেট ভক্তের কাছে সাকিব যেন অনেকটাই অদৃশ্য। আর এটাই হয়তো সাকিব আল হাসানের অর্জন আর প্রাপ্তির হিসাবের গরমিলের সবচেয়ে যথাযত রূপায়ণ। কারণ বাংলাদেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে যে কিনা সাকিব আল হাসানের নাম শোনেনি , আর সাকিবের যেকোনো সহখেলোয়ার বা কোচ কে যদি কেউ সাকিবের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়, একটা কথা বার বার সোনা যাবে – সাকিব একই ২ জন খেলোয়াড়ের সমান, কারণ সাকিব খেলেন একজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসাবে এবং বোলিং ও করেন যেকোনো নিয়মিত বোলার এর মতোই।

কিন্তু বাংলাদেশ থেকে একটু দূরে গেলেই যেন সাকিবের পরিচিতি আর সাকিব কে নিয়ে উচ্ছাসে ভাটা পড়তে শুরু করে। বিশ্বকাপের মতো অমন অতিমানবিক পারফরম্যান্স এর আগে না থাকলেও তার কাছাকাছি পারফরম্যান্স কিন্তু সাকিব তার ক্যারিয়ার এর শুরুর দিক থেকেই ধারাবাহিক ভাবে দেখিয়ে আসছেন, যার প্রমান মিলবে আইসিসির রাঙ্কিং এ সাকিবের দীর্ঘ আধিপত্য। কিন্তু তারপরেও সাকিবের ৬০০ রান আর ১১ উইকেটের পারফরম্যান্সে ক্রিকেট মহলের বিস্ময় দেখে এটাই মনে হয়েছে যে তারা সাকিবের কাছ থেকে এমন খেলা আশা করেন নি আর সাকিবের গত ১০-১২ বছরের ধারাবাহিক সাফল্যের সাথে তারা যেন অনেকটাই অপরিচিত।

সাকিবের সীকৃতি বা মর্যাদার ঘাটতির আরো কিছু উদাহরণ মেলে দেশের বাইরে সাকিবের গ্রহণযোগ্যতার দিকে তাকালে, বিশেষ করে ভারতের আইপিএলে, যেখানে সাকিব ২০১১ সাল থেকে এই নিয়ে টানা ৮ বছর নাম লেখাতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক টি-২০ তে সাকিবের র‍্যাঙ্কিং এর দিকে তাকালে অনেকেই হয়তো ভাববে যে আইপিএলে সাকিব কে নিয়ে নিশ্চয় দলগুলোর মধ্যে টানা হ্যাচড়া শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। কারণ আন্তর্জাতিক টি-২০ তে সাকিব এর রাঙ্কিং যথেষ্ট ঈর্ষণীয়, যেখানে দেখা যায় ২০১৪ সাল থেকে আইসিসির টি-২০ অলরাউন্ডার র‍্যাঙ্কিং এ সাকিব কখনোই তিনের নিচে নামেনি। কিন্তু আইপিএলে সাকিব কে নিয়ে কখনোই দলগুলোর মধ্যে চোখে পড়ার মতো উচ্ছাস বা দর কষাকষি করতে দেখা যায় নি। বরং সাকিবের ধার্য মূল্য বেশিভাগ সময়ই ছিল প্রায় নিচের সারির খেলোয়াড়দের কাতারে। তাতে একটা বিষয় আবারো প্রমান হয় যে র‍্যাঙ্কিং এ সাকিবের অবস্থান যাই হোক  আইপিএলের মতো মহলে সাকিব মধ্যসারির আশেপাশের কোনো এক খেলোয়াড়।

২০১৯ সালে আইপিএলে সাকিব বিক্রি হয় $২৮৯,৩০২ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে, যা কিনা ডোয়াইন ব্রাভো ($৯২৫,৭৬৬), শেইন ওয়াটসন ($ ৫৭৮,৬০৪), আন্দ্রে রাসেল ($১,০০০,০০০), বা কিয়েরন পোলার্ডের ($৭৮১,১১৫) মতো খেলোয়াড়দের থেকে অনেক কম যারা প্রত্যেকেই আইসিসি র‍্যাঙ্কিং সাকিবের নিচে।  ২০১৯  সালের আইপিএলে আকাশচুম্বী দাম ওঠা আরেক খেলোয়াড় ছিলেন বেন স্টোকস, যিনি বিক্রি হন সাকিবেরচে প্রায় ছয় গুন্ বেশি দামে ($১,৮০০,000) যদিও ওই নিলামের সময় তিন ফরমেটের র‍্যাঙ্কিং এই স্টোকস এর অবস্থান ছিল সাকিবের নিচে। নিলাম শেষে টুর্নামেন্ট শুরুর পরও সাকিবের ভাগ্য খোলেনি, পুরো টুর্নামেন্টে সাকিব খেলার সুযোগ পান মাত্র একটি ম্যাচে।

নিচের টেবিলে উপরে উল্লেক্ষিত খেলোয়াড়রাসহ এই সময়ের আরো কয়েকজন আলোচিত অলরাউন্ডারদের আন্তর্জাতিক টি-২০ এর পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:

সূত্র: http://stats.espncricinfo.com

পরিসংখ্যান বা র‍্যাঙ্কিং সাকিব যতই এগিয়ে থাকুক, এই দুটো বিষয়ই কিন্তু অনেকক্ষেত্রে মানুষকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে থাকে, আর মাঠের খেলায় অনেক ধরণের বিষয় থাকে যেগুলো স্কোরবোর্ড, র‍্যাঙ্কিং বা পরিসংখানে ফুটে ওঠে না। আর তাই র‍্যাঙ্কিং, রান আর উইকেট সংগ্রহের দিকে একজন খেলোয়াড় যতই এগিয়ে থাকুক, শুধুমাত্র এই কয়টি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বলা যায় না যে সেই খেলোয়ারটাই সবারচে উপরে।  পরিসংখ্যান বাদেও খেলায় অনেক বিষয় থাকে, যেমন খেলার ফরমেট, আবহাওয়া, কিংবা উইকেটের ধরণ। তাই র‍্যাঙ্কিং এ সাকিবের নিচে থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি বেন স্টোকসকে সাকিবেরচে যোগ্যতর খেলোয়াড় মনে করেন তাহলে তাকে বিশেষভাবে দোষ দেয়া যায় না। আর বিশ্বকাপে স্টোকস এর বিদ্ধংসী পারফরম্যান্সের পর তো স্টোকসের বড়দাম আরো যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু মূল সমস্যাটা অন্যখানে, তা হলো দুজনের দামের পার্থককে। স্টোকস হয়তো অনেক বিচারের সাকিবেরচে শ্রেয়তর খেলোয়াড়, কিন্তু তিনি সাকিবেরচে ৬ গুন্ শ্রেয় খেলোয়াড় নন, কিংবা খেলার দক্ষতার বিচারে সাকিবের অবস্থান স্টোকসের চেয়ে ৫০০% পেছনে নয়, যেমনটা ইঙ্গিত করে আইপিলেরের খেলোয়াড়দের ধার্যকৃত বিক্রয় মূল্যে।

এসব বিষয়ই প্রমান করে যে সাকিব আল হাসান তার ক্যারিয়ার এ যা কিছু অর্জন করেছে সেই তুলনায় তিনি তার প্রাপ্য মর্যাদা বা যথাযত স্বীকৃতি পান নি।

অদৃশ্য সাকিব

দেশের মাটিতে তিনি যতটা জনপ্রিয় বিদেশে হয়তো ঠিক ততটাই অদৃশ্য। প্রায় এক যুগের বেশি সময় র‍্যাঙ্কিং এ আধিপত্য বিস্তার করার পরেও নিরপেক্ষ দর্শকদের মুখে সাকিব যেন প্রায়শই হারিয়ে যাওয়া এক নাম। কিন্তু বারবার হারিয়ে যাওয়ার দোষ কি পুরোটাই দর্শকদের? সাকিবের ক্যারিয়ারের বিশেষ কিছু মুহূর্তের দিকে নজর দিলে দেখা যায় এই বার বার হারিয়ে যাওয়ার দায় ভার অনেকটাই সাকিবের নিজের। ১৩ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার অনেক অর্জনের মাঝে আছে ১৪ টি শতক, ২১ বার এক ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার আর একটি দ্বিশতক। কিন্তু চমকপ্রদক সব অর্জনের পাশাপাশিই সাকিবের ক্যারিয়ার জুড়ে সঙ্গী ছিল বার বার হারিয়ে যাওয়ার প্রবণতা। সাকিবের তারায় ভরা উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের দিকে তাকালেই খুব স্পষ্ট ভাবে চোখে পরে একাধিক কিছু কৃষ্ণ গহ্বর। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ক্লান্তি থেকেই হক বা ইনজুরির কারণেই হক, ভালো খেলতে খেলতেই যেন সাকিব বার বার হারিয়েছেন তার ব্যাট আর বলের ধার। যদিও প্রায় প্রতিবারই দুঃসময় কাটিয়ে ফিরে এসেছেন এবং দিনশেষে ওইসব খারাপ সময় গুলো তার ব্যাটিং বা বোলিং পরিসংখ্যানে খুব অল্পই প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, কিন্তু বার বার হারিয়ে যাওয়ার এই অভ্যাসের কারণেই সাকিব অনেক সময় ছিটকে গেছেন আলোচনার বাইরে।

নিচে সাকিবের ক্যারিয়ার এর খারাপ সময়ের কিছু কারণ তুলে ধরা হলো:

(১) একাধিক ইনজুরিজনিত অনুপস্থিতি

১৩ বছরের বর্ণাট্য ক্যারিয়ার এ ইনজুরি মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বরং সাকিব তার ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই বাহবা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী যতটুকু সময় ইনজুরিজনিত কারণে মাঠের বাইরে থাকার কথা সাকিব যেন অনেক ক্ষেত্রে তারচে একটু বেশিই বাইরে থেকেছেন। ইনজুরির কারণে সাকিব বাদ পড়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখক ম্যাচ থেকে, এবং তার মধ্যে ছিল গুরুত্বপূর্ণ কিছু টুর্নামেন্ট এবং একাধিক ফাইনাল ম্যাচ।

(২) শৃংখলাজনিত সমস্যা এবং অনুপস্থিতি

ইনজুরির চেয়েও সাকিবের ক্যারিয়ারে একাধিক বড় আঘাত আসে শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে। সাকিবের ক্যারিয়ার জুড়েই বার বার উঠে এসেছে ছিল একাধিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভোযোগ। আর ইনজুরি ছাড়াও তাই সাকিব তার ক্যারিয়ারজুড়ে মিস করেছেন উল্লেখযোগ্য সংখক ম্যাচ যার মূল কারণ শৃংখলা লঙ্ঘন। নিচে সাকিবের ক্যারীরের কিছু শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখ করা হলো:

– খেলা চলাকালীন দর্শকের সাথে বাকদন্ড

– খেলা চলাকালীন অবস্থায় টেলিভশন ক্যামেরায় অরুচিশীল অঙ্গভঙ্গি

– প্রধান কোচের সাথে দুর্ব্যবহার

– ভ্রমণরত অবস্থায় দলের হোটেল লবিতে দর্শকের সাথে বাকদন্ড

– খেলাচলাকালীন ড্রেসিং রুম ত্যাগ করা এবং দর্শকের সাথে শারীরিক সংঘর্ষ

– খেলাচলাকালীন আম্পাযারের সাথে দুর্ব্যবহার

– দলীয় চুক্তি লঙ্ঘন করে অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যক্তিগত চুক্তিতে আবন্ধন

– আইসিসির দুর্নীতিদমন আইন লঙ্ঘন

(৩) একাধিক ছুটি বা স্বেচ্ছা নির্বাসন

ইনজুরি এবং শৃঙ্খলালঙ্ঘনের কারণে বাদ পড়া ছাড়াও সাকিব তার ক্যারিয়ার জুড়ে বেশ কয়েকবার গেছেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে। যার মানে শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকার পরেও সাকিব অনুপস্থিত ছিলেন নিজে থেকে ছুটি নেয়ার কারণে।

অভিষেকের পর থেকে এই ৩টি কারণে সব মিলিয়ে সাকিব অনুপস্থিত ছিলেন মোট ৩৮টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ১৩ টি টি-২০ এবং ১৩টি টেস্ট ম্যাচ।

(৪) পারফরম্যান্সের ভাটা

ইনজুরি, স্বেচ্ছা নির্বাসন, বা শৃংখলাজনিত কারণে বাদ, যেটিকেই দায়ি করা হোক বারবার খেলা থেকে ছিটকে পড়াটা সাকিবের ক্যারিয়ার এর জন্য শুভবার্তা বয়ে আনেনি। যদিও পারফরম্যান্সের বিচারে সাকিব কখনোই তলানিতে মিশে যান নি, কিংবা কখনোই ইনজুরির কাছে হার মানেননি যেটা অনেক বড় বড় খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রেই ঘটে, বরং যতবারই খেলার বাইরে ছিলেন, ততবারই ফিরে এসেছেন নিজরূপে। কিন্তু বারবার খেলা থেকে ছিটকে পড়াটা খুব সাদৃশ্য ভাবেই তার পারফরম্যান্সের উপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।  তাই সাকিবের ক্যারিয়ার জুড়ে অসাধারণ সব ইনিংস অরে বোলিং পারফরম্যান্সের মাঝেও রয়েছে বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন কিন্তু উল্লেখযোগ্যসংখক মলিন পারফরমেন্সের চিহ্ন যা সাকিবের নামের সাথে খুবই বেমানান। আর এসমস্ত কারণেই হয়তো ভক্তদের মন থেকে বারবার মুছে গেছে সাকিবের নাম ।

সাকিবের পুরো ক্যারিয়ারের পরিসংখানের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে যে সাকিব  একাধিক পুঞ্জিকা পার করেছেন যেখানে তার ব্যাটিং বা বোলিং গড় ছিল তার পুরো ক্যারিয়ার এর গড়ের থেকেও অনেক খারাপ।

সূত্র: http://stats.espncricinfo.com

অসংগতিপূর্ণ  পারফরমেন্স বা নিয়মিত পারফরমেন্স দিয়ে কর্তৃত্ব বিস্তারের অভাবের আরো কিছু প্রমান মেলে সাকিবের আইপিএলের পরিসংখানের দিকে তাকালে। এযাবৎ বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৪ জন খেলোয়াড় আইপিএলে খেলার জন্য ডাক পেয়েছেন (বাকি তিনজন হলেন তামিম ইকবাল, মাশরাফি, এবং মুস্তাফিজুর রহমান) এবং তাদের মধ্যে সাকিবই  একমাত্র খেলোয়াড় যে কিনা টানা আট বছর আইপিলে খেলতে সফল হয়েছেন। আইপিএলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা বিচার করলে একজন বাংলাদেশী খেলোয়াড়ের জন্য এটা যথেষ্টই একটা বড় অর্জন।  কিন্তু প্রায় প্রতিবছরই খেলার সুযোগ পেলেও দুই এক বছরের কথা বাদ দিলে আইপিএলে সাকিব কখনোই নিয়মিত পারফর্ম করতে পারেন নি বা কখনোই নিজেকে আইপিএলের একজন তারকা হিসাবে প্রতিষ্টিত করতে পারেন নি।

উপসংহার

ক্যারিয়ারজুড়ে ততোধিক পতন বা পারফরম্যান্সের ভাটার সত্ত্বেও সবদিক বিচারে সাকিব বিশ্বের সমসাময়িক সকল অলরাউন্ডারদের মাঝে  সব সময় উপরের দিকেই অবস্থান করেছেন। কিন্তু সাকিবের সমস্যা অন্যখানে, যতবারই তিনি অন্যদের টপকিয়ে  শীর্ষে পৌঁছেছেন  অনেক সময়ই যেন মনে হয়েছে এই শীর্ষ অবস্থানে থেকে কি করা উচিত সেটা তার জানা নেই।  এর সবচে বড় উদাহরণ হলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা লিওনেল মেসি। এরা দুজনই কিন্তু খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করেছেন সম্ভবনাময় বা উদীয়মান ভালো খেলোয়াড় হিসেবে, বিশাল তারকা বা কিংবদন্তি হিসেবে নয়।  কিন্তু আস্তে আস্তে যখন তারা সাফল্যের মুখ দেখা শুরু করে এবং নিজেদের বড় খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্টা করেন বা  সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হন,  তাতে যেন তাদের সাফল্যের খুদা আরো বেড়ে যায়।  আর তাই প্রতিবছরই রোনালদো এবং মেসি নিজেদের কে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায় আর তাই আজ তাদের মহত্বের সীমা  শুধু যুগের  বাঁধনে সীমাবদ্ধ নেই, আজ থেকে ৫০ বছর পরও রোনালদো আর মেসির কথা মনে রাখবে ফুটবলামোদীরা।  ক্রিকেটেও এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে, মাত্রাতিরিক্ত সাফল্যক্ষুদার কারণেই ব্রায়ান লারা, শেইন ওয়ার্ন বা দল হিসাবে রিকি পন্টিং এর অস্ট্রেলিয়াকে এখনো মানুষ মনে রেখেছে, কিংবা এসময়ের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ভিরাট কলি বা স্টিভ স্মিথদেরও এই কাতারে ফেলতে পারেন, যারা এক নম্বর অবস্থানে উঠে এসেই তৃপ্ত হননি। আর অলরাউন্ডারদের মাঝে এর সবচে বড় উদাহরণ জ্যাক কালিস , অলরাউন্ড নৈপুণ্যে বা পরিসংখ্যানে যাকে ছোঁয়ার স্বপ্নও খুব বেশি অলরাউন্ডাররা দেখেন না।

কিন্তু এই কাজটি করতে সাকিব বার্থ হয়েছেন খুব বাজেভাবে।  যতবারই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছেন, র‍্যাঙ্কিং র চূড়ায় উঠেছেন,  সেখান থেকে নিজের অবস্থান আরো শক্ত করার বদলে বার বার ছিটকে গেছেন শীর্ষ থেকে।  শীর্ষস্থান আরো পাকাপোক্ত করার বদলে বারবার সাকিবকে নামতে হয়েছে শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধারের কাজে। আর তাই অনেক সম্ভবনাময় ক্যারিয়ার এর পরও আজ সাকিবের পরিচিতি ‘গরিবের কালিস’ বা ‘গরীবের সোবার্স’ হিসাবে , তাদের যোগ্য উত্তরসূরি  হিসাবে নয়।

সূত্র

ESPN UK. (2018). Shakib Al Hasan is worth 2 players for Bangladesh – Michael Hussey | Cricket World Cup. Retrieved from https://www.youtube.com/watch?v=xPVoB0mCGNQ

ESPNCricinfo. (2019). Cricket Records – Find ICC Cricket Stats Online | ESPNcricinfo.com. Retrieved from http://stats.espncricinfo.com/ci/engine/records/index.html

Indian Premier League. (2018). IPLT20.com – Indian Premier League Official Website. Retrieved November 2, 2019, from https://www.iplt20.com/teams/sunrisers-hyderabad/squad/201/shakib-al-hasan

Kimber, J. (2019). Why aren’t there more true allrounders like Shakib in ODIs? | ESPNcricinfo.com. Retrieved July 23, 2019, from ESPNCRICINFO website: https://www.espncricinfo.com/story/_/id/27070967/why-there-more-true-allrounders-shakib-al-hasan-odis

About the Author

Adlul Kamal is a professional practitioner & researcher in sport and exercise psychology. He has a double master’s degree in sport and exercise psychology from Lund University (Sweden) and Leipzig University (Germany). Adlul has been working in the industry since 2012 and he is a professional member of the Canadian Sport Psychology Association (CSPA). He has worked with athletes in many different sports including Fencing, Soccer, Basketball, Triathlon, Badminton, and Special Olympics Athletes.
Contact Adlul for questions and comments via
Facebook, Twitter, LinkedIn, or email

To visit Adlul’s website please click on: adlulkamal.com

Read this Article in English

One Reply to “সাকিব আল হাসান: অর্জন আর স্বীকৃতির হিসাব”

Leave a Reply